বুধবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৫

তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্ব – একটি বিস্তারিত আলোচনা

 তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্ব – একটি বিস্তারিত আলোচনা



তাহাজ্জুদ হলো রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সবচেয়ে মূল্যবান ও প্রিয় ইবাদত। এটি ফরজ নামাজ নয়, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে এটি ছিল নিয়মিত ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে এই নামাজের জন্য বিশেষভাবে আহ্বান করেছেন এবং এর মাধ্যমে বান্দার মর্যাদা উন্নত করার কথা বলেছেন।

১. কুরআনে তাহাজ্জুদের সরাসরি আহ্বান

সূরা আল-ইসরা (৭৯) আয়াতে আল্লাহ বলেন:

وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ عَسَىٰ أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا

“আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়ো, এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, তোমার রব তোমাকে ‘মাকামে মাহমূদ’ (প্রশংসিত মর্যাদা)-এ উঠাবেন।”

এই আয়াতে আল্লাহ স্বয়ং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাহাজ্জুদের নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে কিয়ামতের দিন সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদা ‘মাকামে মাহমূদ’ ও শাফায়াতের মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সূরা মুজ্জাম্মিলের শুরুর আয়াতগুলোতে আছে:

يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ × قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا × نِصْفَهُ أَوِ انْقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا

“হে বস্ত্রাবৃত (নবী)! রাতে দাঁড়াও, অল্প ছাড়া – অর্ধেক রাত অথবা তার চেয়ে কিছু কম…” (৭৩:১-৩)

পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন, এই নামাজের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর খুব কাছে পৌঁছে যায়।

২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে তাহাজ্জুদ


আয়েশা (রা.) বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদ এত দীর্ঘ করতেন যে, তাঁর পা মোবারক ফুলে যেত। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তো আপনার আগের-পরের সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন, তবু এত কষ্ট কেন?” তিনি বললেন, “আমি কি আল্লাহর শোকরগোজার বান্দা হব না?” (বুখারী, মুসলিম)

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন: “রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের রব দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘কে আছো আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছো আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে দেব? কে আছো ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’” (বুখারী ১১৪৫, মুসলিম ৭৫৮)


৩. তাহাজ্জুদের ফজিলত ও গুরুত্ব


সবচেয়ে কবুল হওয়ার সময়: রাতের শেষ প্রহরে দোয়া কবুলের সবচেয়ে বড় সময়। যখন পৃথিবী নিস্তব্ধ, মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন বান্দা যখন চোখের পানি ফেলে আল্লাহকে ডাকে – সে দোয়া আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়।

গুনাহ মাফের মাধ্যম: হযরত আলী (রা.) বলেন, “যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন – যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো হয়।”

মনের শান্তি ও আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পর্ক: দিনের বেলা হাজার কাজের চাপ, মন ছটফট করে। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন একান্তে আল্লাহর সামনে দাঁড়ালে মনের সব কষ্ট, দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়।

মা-বাবার দোয়া কবুলের বড় মাধ্যম: অনেক আলেম বলেন, যে সন্তান তাহাজ্জুদ পড়ে মা-বাবার জন্য দোয়া করে, তার দোয়া ফেরত আসে না। কারণ আল্লাহ এ সময় নিজেই বান্দাকে জিজ্ঞাসা করেন, “কী চাও?”

দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্য: যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ে, তাদের রিজিকে বরকত হয়, মনের মধ্যে আল্লাহর ভালোবাসা বাড়ে, জীবনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে, এবং কিয়ামতের দিন তাদের চেহারা নূরে ভরে যায়।


৪. সাহাবা-তাবেয়ীদের জীবনে তাহাজ্জুদ


হযরত উমর (রা.) রাতে অর্ধেক তাহাজ্জুদ পড়তেন, অর্ধেক ঘুমাতেন।

হযরত আবু বকর (রা.) পুরো রাত জেগে ইবাদত করতেন।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ৪০ বছর ধরে একই ওয়াক্তে ফজরের ওযুতে তাহাজ্জুদ পড়তেন।

শাইখুল হাদিস যাকারিয়া (রহ.) বলতেন, “আমার সব ইলম তাহাজ্জুদের বরকত।”


৫. আধুনিক জীবনে তাহাজ্জুদের প্রয়োজনীয়তা

আজকের দুনিয়ায় মানুষ ডিপ্রেশনে ভোগে, ঘুমের ওষুধ খায়, কাউন্সেলিং করে। কিন্তু যারা তাহাজ্জুদ পড়া শুরু করেছে, তারা বলে, “আমার মনের সব অশান্তি দূর হয়ে গেছে।” কারণ তাহাজ্জুদ হলো আল্লাহর সাথে একান্ত সাক্ষাৎ। সেখানে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি নেই, শুধু বান্দা আর তার রব।

৬. কীভাবে তাহাজ্জুদ শুরু করবেন?


অন্তত ২ রাকাত থেকে শুরু করুন।

রাতের শেষ ১ ঘণ্টা বা ৪৫ মিনিট আগে উঠুন।

ওযু করে ২ রাকাত পড়ুন, তারপর যত ইচ্ছা দোয়া করুন।

প্রথমে কষ্ট হবে, কিন্তু এক মাস চালিয়ে গেলে আল্লাহ এমন ভালো লাগা দেবেন যে, ঘুম ছেড়ে উঠতে আর কষ্ট হবে না।


শেষ কথা

তাহাজ্জুদ কোনো সাধারণ নামাজ নয়। এটা আল্লাহর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ার মাধ্যম। যে একবার এই স্বাদ পায়, সে আর ছাড়তে পারে না। রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়া অবলম্বন করে।” আর তাকওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো তাহাজ্জুদ।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রতি রাতে তাহাজ্জুদ পড়ার এবং চোখের পানি ফেলে তাঁর কাছে ক্ষমা ও রহমত চাওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।


একটি সুন্দর ইমোশনাল ইসলামিক গল্প: "মায়ের দোয়া"

 


একটি সুন্দর ইমোশনাল ইসলামিক গল্প: "মায়ের দোয়া"

এক ছোট্ট গ্রামে বাস করতো একজন বুড়ি মা, নাম তার ফাতেমা বেগম। তাঁর একমাত্র ছেলে আব্দুল্লাহ। বাবা মারা গিয়েছিলেন অনেক আগেই। আব্দুল্লাহ ছিল মায়ের জীবনের একমাত্র আলো। সে পড়াশোনায় ভালো ছিল, কিন্তু গ্রামে চাকরি না পেয়ে শহরে চলে গেল ভালো কাজের খোঁজে। মা একা থেকে যান গ্রামের ছোট্ট মাটির ঘরে। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর তিনি কেঁদে কেটে দোয়া করতেন,
“ইয়া আল্লাহ! আমার ছেলেকে হেফাজত করো, তার রিজিক হালাল করো, তাকে দ্বীনের পথে রাখো।”
শহরে গিয়ে আব্দুল্লাহ প্রথমে অনেক কষ্ট করল। একটা ছোট কোম্পানিতে চাকরি পেল, কিন্তু বেতন খুব কম। তারপরও প্রতি মাসে যা পারত মাকে পাঠাত। কিন্তু ধীরে ধীরে শহরের চাকচিক্য তাকে পাল্টে দিতে লাগল। বন্ধুদের সাথে আড্ডা, রাত জেগে পার্টি, ধীরে ধীরে নামাজ কমতে লাগল। মাকে ফোন করলেও বলত, “মা, আমি ভালো আছি, চিন্তা কোরো না।” কিন্তু মা বুঝতেন ছেলে দূরে সরে যাচ্ছে। তবুও তিনি রাতের শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদ পড়ে কাঁদতেন, “ইয়া রব! আমার ছেলেকে হেদায়েত দাও। আমি বুড়ি হয়ে গেছি, আমার আর কিছু চাওয়ার নেই, শুধু আমার ছেলেটাকে তুমি ফিরিয়ে নাও।”
একদিন রাতে আব্দুল্লাহ বন্ধুদের সাথে মদ পান করছিল। হঠাৎ তার বুকটা ধড়াস করে উঠল। মনে হল মা ডাকছেন। সে ফোন বের করে দেখল, মায়ের কোনো মিসড কল নেই। তবুও মনটা অস্থির। সে বাসায় ফিরে বিছানায় শুয়ে কাঁদতে লাগল। অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেল। স্বপ্নে দেখল, তার মা কাবার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন আর বলছেন, “আল্লাহ, আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও।” আব্দুল্লাহের বুক ফেটে কান্না এল। সে আর থাকতে পারল না। পরদিন সকালেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামের বাসে উঠে পড়ল।
গ্রামে পৌঁছে সে যখন মায়ের ঘরের দরজায় দাঁড়াল, দেখল মা মাটিতে বসে কোরআন পড়ছেন। আব্দুল্লাহ পড়ে গেল মায়ের পায়ের কাছে। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“মা, আমি পাপী, আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। তুমি ক্ষমা করো।”
মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। দুজনের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। মা বললেন,
“বাবা, মায়ের দোয়া কখনো ফেরত আসে না। আল্লাহ তোমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে এনেছেন।”
সেদিন থেকে আব্দুল্লাহ আবার নামাজ পড়তে শুরু করল। গ্রামে একটা ছোট মাদ্রাসা খুলল। মানুষ তার জীবনের পরিবর্তন দেখে অবাক হয়। আর বুড়ি মা প্রতি রাতে তাহাজ্জুদে শুধু এই দোয়াই করতেন,
“ইয়া আল্লাহ! যেদিন আমি মারা যাব, সেদিনও আমার ছেলেকে তোমার পথে রেখো।”
কয়েক বছর পর মা মারা গেলেন। জানাজায় পুরো গ্রামের মানুষ এল। আব্দুল্লাহ মায়ের কবরের পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“মা, তুমি চিন্তা কোরো না। তোমার দোয়া আমাকে জীবন দিয়েছে, আমি কোনোদিন আল্লাহর পথ ছাড়ব না।”

আল্লাহ আমাদের সবাইকে মা-বাবার দোয়া কবুলের তাওফিক দিন। আমিন।


মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫

গল্পের নাম: অস্তিত্বের ঘ্রাণ

 গল্পের নাম: অস্তিত্বের ঘ্রাণ



অফিসের ল্যাপটপটা শাটডাউন করতেই জানালার কাঁচে বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগল। অনিক ঘড়ির দিকে তাকাল, রাত এগারোটা। কর্পোরেট লাইফে এই সময়টা খুব একটা রাত নয়, কিন্তু আজ শরীরটা বড্ড ক্লান্ত। ড্রইংরুমে ঢুকতেই দেখল মা সোফায় বসে ঝিমোচ্ছেন। চশমাটা নাকের ডগলায় নেমে এসেছে, আর হাতে ধরা সেই পুরনো আমলের একটা কাঁথা, যেটা মা গত শীত থেকে সেলাই করছেন।


অনিকের আওয়াজে মা ধড়মড় করে জেগে উঠলেন। — "ফিলি বাবা? খাবার গরম করব?" অনিক বিরক্তি নিয়ে বলল, "মা, তোমাকে কতবার বলেছি আমার জন্য জেগে থাকবে না। আমি খেয়ে এসেছি। তুমি ঘুমাও।" মা একটু লজ্জিত হাসি হাসলেন। গায়ের কাপড়টা ঠিক করতে করতে বললেন, "ঘুম তো আসছিল না রে। ভাবলাম তুই এলে এক গ্লাস জল অন্তত এগিয়ে দিতে পারব।"


অনিক কোনো উত্তর না দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। মায়ের এই অতিরিক্ত যত্ন মাঝে মাঝে তার কাছে খুব 'ব্যাকডেটেড' আর 'অস্বস্তিকর' লাগে। ও এখন বড় হয়েছে, বড় পজিশনে চাকরি করে, নিজের খেয়াল নিজেই রাখতে পারে—এটা মা কিছুতেই বুঝতে চান না।


পরদিন শুক্রবার। ছুটির দিন। অনিক পুরোনো কাগজপত্রের ফাইল খুঁজছিল। আলমারির তাক খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ তার হাত ঠেকল মায়ের পুরনো জং ধরা টিনের ট্রাঙ্কটায়। এই ট্রাঙ্কটা মা আগলে রাখেন যক্ষের ধনের মতো। অনিক বহুবার বলেছে এটা ফেলে দিতে, কিন্তু মা শোনেননি। কৌতূহলবশত অনিক ট্রাঙ্কটা নামাল। ডালা খুলতেই ন্যাপথালিন আর পুরনো কাপড়ের একটা ভুরভুরে গন্ধ নাকে এল—মায়ের গায়ের গন্ধের মতো।


ভেতরে শাড়ি, কিছু পুরনো বাসন আর একটা লাল মলাটের খাতা। খাতাটা হাতে নিতেই অনিক বুঝল, এটা মায়ের হিসাবের খাতা। মা সংসারের পাই-পয়সার হিসাব রাখতেন একসময়। কিন্তু পাতা উল্টাতেই অনিকের ভ্রু কুঁচকে গেল। এটা শুধু টাকার হিসাব নয়, এটা যেন সময়ের দলিল।


১৯৯৮ সাল, ১০ই অক্টোবর: "আজ অনিকের খুব জ্বর। ডাক্তার বলেছে ভালো খাবার খাওয়াতে। আমার কাছে বাজার করার মতো টাকা নেই। বিয়ের সময় পাওয়া শেষ সোনার আংটিটা আজ বিক্রি করে দিলাম। ও যেন না জানে। জানলে কষ্ট পাবে। ওর বাবা জানলে রাগ করবে, তাই লিখে রাখলাম—হারিয়ে গেছে।"


অনিকের হাতটা কেঁপে উঠল। সে স্পষ্ট মনে করতে পারে সেই সময়ের কথা। সে তখন ক্লাস ফোরে পড়ে। মা তাকে বলেছিল, আংটিটা বাথরুমে পড়ে গেছে। বাবা মাকে কত বকাঝকা করেছিলেন অসাবধানতার জন্য! মা সেদিন একটা কথাও বলেননি, শুধু আঁচল দিয়ে চোখ মুছেছিলেন। আর অনিক? সে দিব্যি মাছ-মাংস খেয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছিল।


পাতা উল্টাতে লাগল অনিক।


২০০৫ সাল, ১৪ই এপ্রিল: "অনিকের বন্ধুদের সবার দামি কেডস আছে। ও স্কুল থেকে এসে খুব কাঁদল। ওর নাকি খুব লজ্জা করে পুরনো জুতো পরে যেতে। আমি মাসের বাজারের টাকা থেকে একটু একটু করে জমিয়ে রেখেছিলাম আমার চশমা বদলাব বলে। চশমাটা থাক, ঝাপসা চোখেও কাজ চলে যাবে। কাল ওর জন্য নতুন জুতো আনব। আমার ছেলের মুখে হাসি ফুটলে আমার পৃথিবী পরিষ্কার হয়ে যায়।"


অনিকের মনে পড়ল সেই সাদা কেডসগুলোর কথা। সে কী খুশিই না হয়েছিল! কিন্তু একবারও খেয়াল করেনি যে মায়ের চশমার কাঁচটা ফাটা ছিল প্রায় ছ'মাস ধরে। মা সেলাই করতেন ওই ভাঙা চশমা পরেই। অনিক তখন নিজের আনন্দে এতই মগ্ন ছিল যে মায়ের ত্যাগের ছিটেফোঁটাও তার চোখে পড়েনি।


২০১৫ সাল, ঈদের আগের দিন: "অনিক আজ ফোন করেছিল। ও এবারও ঈদে বাড়ি আসবে না। অফিসের কাজ। খুব কান্না পাচ্ছিল, কিন্তু ওকে বুঝতে দিইনি। ও বলল, 'মা, টাকা পাঠিয়েছি, নিজের জন্য ভালো একটা শাড়ি কিনো।' বোকা ছেলেটা জানে না, ও বাড়ি না এলে বেনারসি পরলেও আমার ঈদ হয় না। তবুও ওর মঙ্গলের জন্য দোয়াই করলাম। ও ভালো থাকুক, সুখে থাকুক।"


অনিকের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। সেদিনের কথা মনে আছে তার। সে আসলে বন্ধুদের সাথে ট্যুরে গিয়েছিল, মাকে মিথ্যে বলেছিল অফিসের কাজের কথা। মা কি সেটা বুঝতে পেরেছিলেন? হয়তো মায়ের মন সব বোঝে।


ডায়েরির শেষ পাতাটা লেখা হয়েছে মাত্র তিন দিন আগে। লেখাটা একটু অস্পষ্ট, মায়ের হাত হয়তো কাঁপছিল।


বর্তমান: "অনিক ইদানীং খুব ব্যস্ত। আমার সাথে কথা বলার সময় পায় না। সেদিন ওর ঘরে ভুল করে ঢুকে পড়েছিলাম যখন ও মিটিংয়ে ছিল। ও খুব রেগে গিয়ে বলল, 'মা, তুমি কেন বারবার ডিস্টার্ব করো?' আমার খুব লজ্জা লাগল। আমি কি খুব বোঝা হয়ে যাচ্ছি ওর কাছে? আমি তো শুধু দেখতে গিয়েছিলাম ও ঠিকমতো খেয়েছে কি না। শরীরটা আজকাল ভালো যাচ্ছে না। বুকটা খুব ধড়ফড় করে। কিন্তু অনিককে বলব না। ও ব্যস্ত, টেনশন করবে। আমি চলে গেলে ওর হয়তো একটু শান্তি হবে, নিজের মতো থাকতে পারবে।"


খাতাটা অনিকের হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল। বাইরের আকাশটা আজ খুব পরিষ্কার, কিন্তু অনিকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। সে নিজেকে খুব আধুনিক, শিক্ষিত আর সফল মনে করত। কিন্তু আজ এই জং ধরা ট্রাঙ্কের সামনে বসে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যর্থ আর দরিদ্র মানুষ মনে হচ্ছে।


সে দৌড়ে মায়ের ঘরের দিকে গেল। মা তখন জায়নামাজে বসে আছেন। জোহরের নামাজ শেষ করে মোনাজাত ধরেছেন। অনিক দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনল, মা ফিসফিস করে বলছেন, "হে আল্লাহ, আমার অনিককে তুমি ভালো রেখো। ওর যেন কোনো বিপদ না হয়। ওর সব মুশকিল তুমি আসান করে দিও। আর আমাকে মাফ করে দিও যদি আমি ওর কোনো কষ্টের কারণ হই।"


অনিক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে মায়ের পিঠ জড়িয়ে ধরল। জায়নামাজেই মায়ের কোলে মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে উঠল সে। মা চমকে উঠলেন। অনিকের মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যস্ত হয়ে বললেন, "কী হয়েছে বাবা? শরীর খারাপ লাগছে? অফিসে কিছু হয়েছে?"


অনিক কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু মায়ের জীর্ণ শাড়ির আঁচলটা মুঠো করে ধরে রইল। এই সেই গন্ধ। ন্যাপথালিন, হলুদ আর ঘামের মিশেলে তৈরি এক অদ্ভুত গন্ধ—যা পৃথিবীর কোনো দামি পারফিউমে নেই। এই গন্ধটা নিরাপত্তার, এই গন্ধটা নিঃস্বার্থ ভালোবাসার।


অনিকের কান্না দেখে মায়ের চোখও ভিজে উঠল। তিনি জানেন না কেন ছেলে কাঁদছে, তবুও তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে রাখলেন। ঠিক যেমন ছোটবেলায় মেঘ ডাকলে অনিক মায়ের বুকে মুখ লুকাত।


কিছুক্ষণ পর অনিক মুখ তুলল। মায়ের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, "মা, আজ বিকেলে আমরা ঘুরতে যাব।" মা অবাক হয়ে বললেন, "কোথায়? তোর না কাজ আছে?" — "কাজ থাকলেও যাব। তোমার সেই পছন্দের শাড়ির দোকানে যাব, তারপর ফুচকা খাব। আর শোনো, কাল থেকে তুমি আমার ঘরে যখন খুশি আসবে। মিটিং থাক বা না থাক, তুমি এলে আমার কোনো ডিস্টার্ব হয় না মা। তুমিই তো আমার সব।"


মা কিছু বললেন না, শুধু তাঁর ঝাপসা চোখের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে যেন হাজার ওয়াটের আলো। অনিক বুঝল, মায়ের এই হাসিটার দাম তার অফিসের যেকোনো প্রমোশনের চেয়ে অনেক বেশি।


বিকেলে মাকে নিয়ে রিকশায় করে যাওয়ার সময় অনিক ভাবছিল, আমরা সারা জীবন সুখ খুঁজি বাইরে, অথচ সুখের খনিটা আমাদের ঘরেই অপেক্ষায় থাকে। মায়েরা কিছু চায় না, শুধু একটু সময় আর দুটো মিষ্টি কথা চায়।


অনিক মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ওই ডায়েরির শেষ পাতায় সে আর কোনো কষ্টের কথা লিখতে দেবে না। এখন থেকে ডায়েরির পাতায় শুধু আনন্দের গল্প থাকবে। কারণ, মা আছে বলেই অনিকের অস্তিত্ব আছে। মায়ের হৃদস্পন্দন থেমে গেলে অনিকের পৃথিবীটাও যে নিথর হয়ে যাবে।


লেখকের নোট ও পাঠকের জন্য ভাবনা

গল্পটি পড়ার পর হয়তো আপনারও ইচ্ছে করছে এখনই মায়ের কাছে ছুটে যেতে বা মাকে একটা ফোন করতে। দেরি করবেন না। আমাদের ব্যস্ততা কোনোদিন শেষ হবে না, কিন্তু মা একদিন হারিয়ে যাবেন। তখন হাজারো চোখের জল বা অনুশোচনা মাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।


আজই মাকে বলুন, "মা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি।"

এক অচেনা হাতের উষ্ণতা: দীর্ঘ পথের কাব্য

 

গন্তব্য ছিল বহুদূরের শহর। মধ্যবিত্তের বাসযাত্রা, তাই বিলাসবহুল কোনো আয়োজন ছিল না; ছিল কেবল সস্তা, মজবুত লাল রঙের সিট, যার ফ্রেমে মরচে আর ধুলোর পুরোনো ইতিহাস জড়ানো। জানালাগুলো কাঁপছিল ইঞ্জিনের একটানা শব্দে, যেন যন্ত্রটা প্রতি মুহূর্তে ঘোষণা করছে তার কঠোর পরিশ্রমের কথা। বাইরে তখন কাঠফাটা রোদ, সেই আলো বাসের ভেতরে এসে কাঁচের চিড় আর ধুলোর স্তর ভেদ করে এক মায়াবী আলো-আঁধারি তৈরি করেছে।


আমি জানালার ধারে বসে ছিলাম। ভ্রমণ আমাকে বরাবরই এক ধরনের ব্যক্তিগত নির্জনতা দেয়। এই সময়ে আমার ভেতরের মানুষটা মুক্তি পায় শহরের কোলাহল থেকে, অফিসের রুটিন থেকে। কিন্তু এই মুক্তিও কখনও কখনও একাকীত্বের ভারে নুয়ে পড়ে। দীর্ঘ পথ, অচেনা মুখ আর গন্তব্যের অনিশ্চয়তা এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি করে। আমি বাইরে তাকাচ্ছিলাম, কিন্তু আসলে দেখছিলাম না। আমার চোখ ছিল মাঠে, বৃক্ষে, ছোট ছোট জনপদে, কিন্তু মন ছিল হাজার মাইল দূরে—নিজের ভেতরে।


আমার সামনের সিটে যিনি বসেছিলেন, তিনি ছিলেন একজন মহিলা। তার মাথায় জড়ানো ছিল নীল-সাদা চেকের একটি ওড়না বা শাড়ি, যা প্রথম ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ওড়নার ফাঁক দিয়ে তার আলতো নড়াচড়া টের পাওয়া যাচ্ছিল। আর তার পাশেই ছিল একটি ছোট ছেলে, হয়তো পাঁচ বা ছয় বছর বয়স। বাচ্চাদের সহজাত চঞ্চলতা তাকে এই যাত্রাতেও স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। কানে আসছিল তার মৃদু ফিসফিসানি, কখনও খেলনার গাড়ির চাকার মতো পা দিয়ে সিটের পেছনে আলতো টোকা। সে হয়তো তার মাকে বারবার জিজ্ঞাসা করছিল—‘আর কত দূর? আমরা কি পৌঁছে গেছি?’ কিন্তু সেই জিজ্ঞাসাগুলো বাসের ইঞ্জিনের একটানা আওয়াজে প্রায় মিলিয়ে যাচ্ছিল।


সময় যেন থমকে গিয়েছিল। যাত্রার মাঝপথ, এই সময়টা সবচেয়ে বেশি ক্লান্তিকর—গন্তব্য তখনও অনেক দূরে, আর ফেলে আসা পথও কম নয়। সবাই তখন হয় ঘুমন্ত, নয়তো তন্দ্রাচ্ছন্ন। বাইরে তপ্ত হাওয়া আর ভেতরে শীতল নীরবতা। ঠিক সেই অবসাদগ্রস্ত মুহূর্তে, সিটের নিচে সামান্য যে ফাঁকা জায়গাটা ছিল, সেই লাল ফ্রেমের নিচ দিয়ে হঠাৎ কিছু একটা নড়ে উঠল।


প্রথমে আমি ভেবেছিলাম হয়তো কোনো ব্যাগ বা কাপড়ের অংশ সরে গেছে। কিন্তু না, সেটি ছিল একটি ছোট্ট হাত। ছেলেটির হাত।

হাতটি ছিল তুলতুলে, আঙুলগুলো গোলগাল, সদ্য ধোয়া বাসের কাঁচের মতোই ঝকঝকে। হাতটি বের হওয়ার ভঙ্গিটি ছিল বেশ দ্বিধাগ্রস্ত—যেন পৃথিবীর এই প্রান্তে এসে সে কিছুটা ভয় পাচ্ছে, আবার ভেতরে ভেতরে তার কৌতূহলও অদম্য। এটি ছিল একটি নীরব প্রশ্ন, একটি অলিখিত আমন্ত্রণ। এটা স্পষ্টতই কোনো ভিক্ষার হাত ছিল না, বা কোনো সাহায্যের আবেদনও ছিল না—এটি ছিল কেবলই এক শিশুর খেলার সঙ্গী খোঁজার সরল প্রচেষ্টা। এই বিশাল পৃথিবীতে, এই সংকীর্ণ বাসযাত্রায়, সে তার চারপাশের অচেনা মানুষদের সঙ্গে একটি সংযোগ তৈরি করতে চাইছিল।


আমার সারা শরীরের আলস্য মুহূর্তের মধ্যে কেটে গেল। দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততা আমাকে প্রথমে বলতে চাইলো—‘অপেক্ষা করো, এটা এড়িয়ে যাও।’ কিন্তু সেই ছোট্ট হাতের নিষ্পাপ সারল্য আমার সেই দেয়াল ভেঙে দিল। সেই হাতটি সেখানে স্থির হয়ে অপেক্ষা করছিল—নাছোড়বান্দা একটি আশার প্রতীক হয়ে। এই মুহূর্তে, আমি একজন অচেনা যাত্রী নই, কেবল একজন মানুষ।


আমি আমার হাতটা সন্তর্পণে এগিয়ে দিলাম। আমার হাতটি ছেলেটির হাতের তুলনায় ছিল অনেক বড়, কর্মঠ, হয়তো কিছুটা রুক্ষ। যখন আমার আঙুলগুলো সেই নরম, তুলতুলে হাতের স্পর্শ পেল, একটা বিদ্যুত্‍প্রবাহ যেন আমার ভেতর দিয়ে চলে গেল। সেই মুহূর্তটি ছিল নীরবতার চেয়েও নিবিড়। আমরা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না, তবু দুটি হাত যেন সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন জগতকে এক করে দিল। আমার মনে হলো, আমি শুধু একটা হাত ধরিনি, আমি ধরেছি তার কৌতূহলকে, তার আনন্দকে, তার নির্ভেজাল বিশ্বাসকে।


সেই সংযোগ ছিল একান্তই ক্ষণিকের। হাতের উষ্ণতাটুকু অনুভব করার আগেই, হয়তো বা তার মা তাকে দেখতে পেয়েছিলেন, কিংবা সে নিজেই তার কৌতূহল নিবৃত্ত করতে পেরেছিল—হাতটি দ্রুতই সিটের আড়াল দিয়ে ভেতরে টেনে নেওয়া হলো।


কিন্তু সেই এক সেকেন্ডের নীরব চুক্তি আমার ভেতরে এক গভীর প্রভাব ফেলে গেল। ছেলেটি হয়তো দু-মিনিট পরই সব ভুলে তার অন্য খেলায় মনোযোগ দিল। কিন্তু আমি ভুলতে পারলাম না। গাড়ির ইঞ্জিনের একটানা শব্দ তখন আমার কানে আর একঘেয়ে লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, প্রতিটা ঝাঁকুনি যেন সেই ছোট্ট হাতের নরম স্পর্শের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।


বাসের জানালার কাঁচের বাইরে তপ্ত রোদ তখনো তার তেজ দেখাচ্ছে, কিন্তু আমার ভেতরে যেন এক ফোঁটা স্নিগ্ধ বৃষ্টির আগমন ঘটেছে। জীবনের দীর্ঘ যাত্রাপথে আমরা সবাই কত শত মানুষের ভিড়ে একা হয়ে যাই। সেই ভিড়ে, একটি সম্পূর্ণ অচেনা শিশু যখন সিটের ফাঁক দিয়ে তার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে দেয় বন্ধুত্বের জন্য, তখন মনে হয়—মানুষের মাঝে যে সম্পর্কগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো আসলে কোনো ভাষা বা প্রতিশ্রুতির তোয়াক্কা করে না। সেগুলো জন্ম নেয় মুহূর্তের সারল্য আর উষ্ণতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে।


যাত্রা এখনো বাকি, কিন্তু এখন আর তা ক্লান্তিকর নয়। আমি এখন আমার ভেতরে সেই ছোট্ট হাতের নরম স্পর্শের রেশ নিয়ে বাকি পথটুকু হাসিমুখে পাড়ি দিতে প্রস্তুত।



এক দরিদ্র কাঠুরে ও আল্লাহর অলৌকিক রিযিকের গল্প: যা আপনার চোখ খুলে দেবে

  Muhabbot Hossain বর্তমান সময়ে আমরা অনেকেই রিযিক বা জীবিকা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় থাকি। একটু আর্থিক অনটন আসলেই আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু আমরা...