বাবা-মা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বাবা-মা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

"ফিরে আসার পথ"

 

প্রথম পর্ব: ভাঙা ঘরের স্বপ্ন

রহমত মিয়া যখন রিকশা নিয়ে বের হতেন, তখন তার একমাত্র লক্ষ্য থাকত ছেলে শান্তর স্কুলের বেতন আর ভালো মন্দ কিছু খাবার জোগাড় করা। শান্তর মা মাজেদা বেগম মানুষের বাসায় কাজ করে যা পেতেন, তার সবটুকু দিয়ে শান্তর জন্য খাতা-কলম কিনতেন। তাদের নিজেদের বলতে কোনো স্বপ্ন ছিল না, তাদের সব স্বপ্ন ছিল শান্তকে ঘিরে।


শান্ত যখন কলেজে পড়ার সুযোগ পেল, তখন রহমত মিয়া নিজের পৈত্রিক ভিটেমাটির শেষ অংশটুকু বিক্রি করে দিলেন। পাড়ার লোক বলেছিল, "রহমত, শেষ সম্বলটুকু বেঁচে দিলে বুড়ো বয়সে থাকবে কোথায়?" রহমত মিয়া হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, "আমার ছেলে মানুষের মতো মানুষ হলে সারা আকাশটাই আমার ছাদ হবে।"


শান্ত শহরে গিয়ে পড়াশোনা শেষ করল। বড় এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি হলো তার। রহমত মিয়া আর মাজেদা বেগম সেদিন খুশিতে সারারাত ঘুমাননি। তারা ভাবলেন, এবার বোধহয় অভাবের দিন শেষ হলো।


দ্বিতীয় পর্ব: দূরত্বের দেওয়াল

চাকরি পাওয়ার পর শান্তর জীবনে আমূল পরিবর্তন এল। সে শহরে বিয়ে করল এক উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েকে। বিয়ের সময় বাবা-মাকে নিয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেখানে তাদের পরিচয় দিতে সে একপ্রকার লজ্জাই পাচ্ছিল। ছেঁড়া পাঞ্জাবি পরা বাবা আর সাধারণ সুতির শাড়ি পরা মাকে আধুনিক শহরের আভিজাত্যের মাঝে বড় বেমানান লাগছিল।


বিয়ের পর শান্তর বাড়ি আসা ধীরে ধীরে কমে গেল। ফোন করলেও সে খুব অল্প সময়ে কথা শেষ করে দিত। মাজেদা বেগম ছেলের জন্য পিঠা বানিয়ে পাঠাতেন, কিন্তু শান্ত সেই পিঠা ডাস্টবিনে ফেলে দিত এই ভেবে যে, গ্রাম থেকে আসা খাবারে জীবাণু থাকতে পারে।


একবার রহমত মিয়ার খুব অসুখ হলো। মাজেদা বেগম শান্তকে ফোন করে বললেন, "বাজান, তোর বাপের অবস্থা ভালো না। একবার দেখে যা।"

শান্ত বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল, "মা, আমার সামনের সপ্তাহে প্রজেক্ট সাবমিশন। এখন আসা সম্ভব না। আমি কিছু টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি, ডাক্তার দেখিয়ে নিও।"


টাকা এল ঠিকই, কিন্তু বিছানায় পড়ে থাকা অসুস্থ বাবা টাকার চেয়ে ছেলের হাতের স্পর্শটা বেশি চেয়েছিলেন। রহমত মিয়া সেই রাতে মাজেদা বেগমকে ধরে ফিসফিস করে বলেছিলেন, "ও মাজেদা, আমাদের শান্ত কি খুব বড় হয়ে গেছে? আমাদের ছোট ঘরটাতে কি ওর আর জায়গা হবে না?"


তৃতীয় পর্ব: একটি শূন্য চেয়ার ও শেষ উপলব্ধি

কয়েক বছর পর। শান্ত এখন এক বিশাল ফ্ল্যাটের মালিক। তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সে ব্যস্ত। একদিন সকালে শান্তর কাছে খবর এল তার বাবা মারা গেছেন। খবরটা শুনে শান্তর ভেতরটা কেমন জানি ফাঁকা হয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে গ্রামে পৌঁছাল।


গ্রামের সেই পুরনো জীর্ণ বাড়িটা তখন লোকে লোকারণ্য। বাড়ির উঠোনে সাদা কাফনে মোড়ানো বাবার নিথর দেহ। মা এক কোণে পাথরের মতো বসে আছেন। শান্তকে দেখে তিনি একবারও কাঁদলেন না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।


গ্রামের এক প্রবীণ লোক শান্তর হাতে একটা ডায়েরি আর একটা কাঠের বাক্স দিলেন। তিনি বললেন, "তোর বাবা মরে যাওয়ার আগেও বলছিলেন— 'আমার শান্ত যেন কষ্ট না পায়। ও শহর থেকে আসলে ওকে এই বাক্সটা দিস'।"


শান্ত কাঁপাকাঁপা হাতে বাক্সটা খুলল। ভেতরে দেখল তার ছোটবেলার প্রথম ছেঁড়া জুতো জোড়া, তার স্কুলের রিপোর্ট কার্ড এবং কিছু পুরনো জমানো টাকা। আর ডায়েরির পাতায় বাবার শেষ লেখাটি ছিল এমন:


"বাবা শান্ত, আমি জানতাম তুই ব্যস্ত থাকবি। তাই নিজের দাফনের টাকাটা রিকশা চালিয়ে তিল তিল করে জমিয়ে রেখেছি। তোর কাছে চাওয়ার মতো আমার কিছু নেই। শুধু একটা অনুরোধ— তোর মা'কে তোর সাথে শহরে নিয়ে যাস। ও খুব একা হয়ে পড়বে। ওকে বেশি কিছু দিতে হবে না, শুধু দিনে একবার 'মা' বলে ডাকিস। ও তাতেই পেট ভরে খাবে।"


শান্ত ডায়েরিটা পড়া শেষ করতে পারল না। তার বুক ফেটে কান্না এল। সে মা'র কাছে ছুটে গিয়ে চিৎকার করে বলল, "মা, আমায় মাফ করে দাও! চলো তুমি আমার সাথে শহরে থাকবে।"


মা শান্তর দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বললেন, "শহরে গিয়ে কী হবে বাবা? তোর বাবা এখানে একা শুয়ে থাকবে, আমি ওকে ছেড়ে কোথাও যাব না। তুই বরং তোর শহরে ফিরে যা, বড় মানুষ হতে হলে তো মায়া ত্যাগ করতে হয়।"


শান্ত সেদিন বুঝতে পারল, সে অনেক বড় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাবা-মায়ের হৃদয়ের কাছে সে আজ চরমভাবে দেউলিয়া। সে আকাশসমান অট্টালিকা বানিয়েছে, কিন্তু সেই অট্টালিকায় বাবা-মায়ের দোয়ার যে শীতল ছায়া ছিল না, তা সে আজ প্রথম বুঝতে পারল।


উপসংহার:

বাবা-মা আমাদের জীবনের সেই বটবৃক্ষ, যারা নিজেদের রোদে পুড়িয়ে আমাদের ছায়া দেন। তারা যখন চলে যান, তখন মাথার ওপরের সেই ছাদ চিরতরে হারিয়ে যায়। সময় থাকতে তাদের আগলে রাখুন, কারণ কবরের ওপার থেকে আর কাউকে ফিরে পাওয়া যায় না।


গল্পটি পড়ে কি আপনার মনে হচ্ছে আমরা আসলেই আমাদের আপনজনদের সময় দিতে পারছি না?

এক দরিদ্র কাঠুরে ও আল্লাহর অলৌকিক রিযিকের গল্প: যা আপনার চোখ খুলে দেবে

  Muhabbot Hossain বর্তমান সময়ে আমরা অনেকেই রিযিক বা জীবিকা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় থাকি। একটু আর্থিক অনটন আসলেই আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু আমরা...