emotional লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
emotional লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

“আমি আল্লাহর কাছে আমার মায়ের সুস্থতা চেয়েছিলাম… আল্লাহ আমাকে তার জানাজা দিয়েছিলেন। সেদিন বুঝেছিলাম—সব দোয়ার উত্তর আমরা বুঝতে পারি না।”

 ফজরের আজানের ঠিক আগে, গ্রামের কাঁচা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট কবরটার দিকে তাকিয়ে রহিমের মনে হলো—এই কবরটাই বুঝি তার জীবনের সবচেয়ে জীবন্ত সত্য।

কারণ এখানে শুয়ে আছে এমন একজন মানুষ, যাকে বাঁচাতে সে সারা জীবন দোয়া করেছে, আর হারানোর পর বুঝেছে—দোয়ার মানে সব সময় “পাওয়া” নয়।




রহিম ছিল একেবারেই সাধারণ ছেলে। জন্ম এক দরিদ্র ঘরে, বেড়ে ওঠা মসজিদের আজান আর মায়ের কোরআন তিলাওয়াতের শব্দে। তার বাবা হাশেম আলী ছিলেন গ্রামের মুয়াজ্জিন। ভোরের অন্ধকারে বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে মসজিদের মিনারে উঠে আজান দেওয়া—এই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আর সবচেয়ে বড় সম্মান।


রহিম ছোটবেলা থেকেই বাবার পেছনে পেছনে ঘুরত। আজান শেষে বাবা যখন নিচে নামতেন, রহিম দৌড়ে গিয়ে বলত,

“আব্বা, আজানের সময় আল্লাহ কি আমাদের কথা শোনেন?”


বাবা হাসতেন। তারপর কপালে হাত রেখে বলতেন,

“আল্লাহ সব সময়ই শোনেন। কিন্তু আজানের সময় মানুষের হৃদয় বেশি খোলা থাকে।”


এই কথাটা রহিম আজীবন মনে রেখে দিয়েছে।



রহিমের মা—আমিনা খাতুন—ছিলেন নীরব কষ্টের প্রতীক। মুখে কখনো অভিযোগ নেই, চোখে সব সময় দোয়ার জল। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু দোয়ার অভাব ছিল না।


একদিন রহিম জিজ্ঞেস করেছিল,

“আম্মা, আমরা এত গরিব কেন?”


মা থেমে গিয়েছিলেন। তারপর শান্ত গলায় বলেছিলেন,

“গরিব মানে টাকা কম, সন্তান না। আল্লাহ যাকে সন্তান দেয়, তাকে আসলে ধনীই বানায়।”


এই কথাটা তখন রহিম পুরো বোঝেনি। অনেক পরে বুঝেছিল—অত্যন্ত দেরিতে।



সময় গড়াতে গড়াতে রহিম বড় হলো। স্কুল শেষ করে শহরে পড়তে গেল। শহর তাকে নতুন স্বপ্ন দিল, নতুন ভয়ও দিল। শহরের আলো-ঝলমল জীবনে সে দেখল—অনেক মানুষ আছে, যাদের টাকা আছে, সময় নেই; হাসি আছে, শান্তি নেই।


রহিম নিয়মিত নামাজ পড়ত। কিন্তু একা নামাজ পড়া আর বাবার কণ্ঠে আজান শোনা—এই দুইয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য ছিল।


গ্রামে ফিরে গেলে বাবা তাকে জড়িয়ে ধরতেন। মা চুপচাপ চোখ মুছতেন।

রহিম তখন ভাবত—এই মানুষগুলোর জন্যই তাকে বড় কিছু করতে হবে।



একদিন শহর থেকে ফোন এলো। বাবার কণ্ঠ কাঁপছিল।

“রহিম, তোর আম্মার শরীর ভালো না। ডাক্তার দেখাতে হবে।”


রহিম পরদিনই ছুটি নিয়ে গ্রামে ফিরল।

মাকে দেখে বুকের ভেতর কেমন যেন ভেঙে গেল। আগের মতো শক্ত হাতে আর কাজ করতে পারেন না। নামাজের পর দীর্ঘক্ষণ জায়নামাজে বসে থাকেন।


রহিম একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করল,

“আম্মা, তোমার কষ্ট হয়?”


মা মৃদু হাসলেন।

“কষ্ট তো হয় রে। কিন্তু কষ্টই তো মানুষকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যায়।”



ডাক্তার রিপোর্ট ভালো ছিল না। দীর্ঘ চিকিৎসা দরকার। টাকা দরকার। অনেক টাকা।


রহিম চাকরি খুঁজতে শুরু করল। অবশেষে একটা চাকরি পেল—মোটামুটি বেতন। সে শহরে থেকেই টাকা পাঠাতে লাগল।


প্রতিদিন নামাজের পর সে একটাই দোয়া করত—

“হে আল্লাহ, আমার আম্মাকে সুস্থ করে দাও। আমি সব কিছু দিতে রাজি।”


এই দোয়াটা সে হাজার বার করেছে।

কিন্তু দোয়ার ভেতরে একটা ভুল ছিল—সে ভাবছিল, দোয়া মানেই শর্ত।



এক রাতে মা ফোনে বললেন,

“রহিম, তুই বেশি কষ্ট করছিস না তো?”


রহিম বলল,

“না আম্মা। তোমার জন্য কষ্ট করলে সেটা কষ্ট হয় না।”


মা চুপ করে গেলেন। তারপর বললেন,

“শোন, সব দোয়ার উত্তর এই দুনিয়ায় পাওয়া যায় না। কখনো কখনো আল্লাহ পরকালের জন্য জমা রাখেন।”


রহিম তখনো বুঝতে চায়নি।



মাসের পর মাস চিকিৎসা চলল। মায়ের শরীর একটু ভালো হলো, আবার খারাপ হলো।

একদিন হঠাৎ বাবার ফোন এলো। কণ্ঠে অদ্ভুত শান্তি।


“রহিম, তুই কাল ভোরে আসতে পারিস?”


রহিমের বুক কেঁপে উঠল।

“কেন আব্বা?”


বাবা বললেন,

“আম্মা তোকে দেখতে চায়।”



রহিম সারা রাত ট্রেনে বসে শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

ভোরে গ্রামে পৌঁছে দৌড়ে ঘরে ঢুকল।


মা বিছানায় শুয়ে। চোখে আলো কম, মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি।


রহিম কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“আম্মা, আমি এসে গেছি।”


মা কষ্ট করে হাত তুললেন।

“আলহামদুলিল্লাহ।”


তারপর খুব ধীরে বললেন,

“রহিম, নামাজ ছাড়িস না। মানুষ কষ্ট দিলে ক্ষমা করে দিস। আর কখনো ভাবিস না—আল্লাহ তোকে ভুলে গেছেন।”


এই ছিল তার শেষ কথা।



ফজরের আজানের আগেই আমিনা খাতুন দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন।


বাবা আজান দিলেন সেদিনও। কণ্ঠ ভাঙেনি। কিন্তু রহিম জানত—এই আজান আর আগের মতো নয়।


মায়ের জানাজা শেষে রহিম কবরের পাশে বসে থাকল।

তার মনে হচ্ছিল—এত দোয়া করেও কেন?


ঠিক তখন বাবার কণ্ঠ শোনা গেল,

“রহিম, তুই কি জানিস—তোর আম্মা কখনো সুস্থতার জন্য দোয়া করেনি?”


রহিম অবাক হয়ে তাকাল।


বাবা বললেন,

“সে শুধু বলত—‘হে আল্লাহ, আমাকে এমন বানাও, যেন কষ্টে তোমাকে ভুলে না যাই।’”


১০


সেই দিন রহিম বুঝল—ইসলামে কষ্ট মানে শাস্তি না। অনেক সময় কষ্ট মানেই পরীক্ষা।

আর মৃত্যু মানে শেষ না—শুরু।


মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সে প্রথমবার আল্লাহর কাছে কিছু চাইল না।

শুধু বলল,

“হে আল্লাহ, আমি রাজি। তুমি যেভাবে চাও।”


ফজরের আজান ভেসে এলো।

রহিমের চোখে পানি ছিল, কিন্তু হৃদয়ে ছিল অদ্ভুত শান্তি।


কারণ সে বুঝে গেছে—

সব হারানো আসলে হারানো না।

আর সব কান্না দুঃখের না—কিছু কান্না ঈমানের।

এক দরিদ্র কাঠুরে ও আল্লাহর অলৌকিক রিযিকের গল্প: যা আপনার চোখ খুলে দেবে

  Muhabbot Hossain বর্তমান সময়ে আমরা অনেকেই রিযিক বা জীবিকা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় থাকি। একটু আর্থিক অনটন আসলেই আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু আমরা...