গন্তব্য ছিল বহুদূরের শহর। মধ্যবিত্তের বাসযাত্রা, তাই বিলাসবহুল কোনো আয়োজন ছিল না; ছিল কেবল সস্তা, মজবুত লাল রঙের সিট, যার ফ্রেমে মরচে আর ধুলোর পুরোনো ইতিহাস জড়ানো। জানালাগুলো কাঁপছিল ইঞ্জিনের একটানা শব্দে, যেন যন্ত্রটা প্রতি মুহূর্তে ঘোষণা করছে তার কঠোর পরিশ্রমের কথা। বাইরে তখন কাঠফাটা রোদ, সেই আলো বাসের ভেতরে এসে কাঁচের চিড় আর ধুলোর স্তর ভেদ করে এক মায়াবী আলো-আঁধারি তৈরি করেছে।
আমি জানালার ধারে বসে ছিলাম। ভ্রমণ আমাকে বরাবরই এক ধরনের ব্যক্তিগত নির্জনতা দেয়। এই সময়ে আমার ভেতরের মানুষটা মুক্তি পায় শহরের কোলাহল থেকে, অফিসের রুটিন থেকে। কিন্তু এই মুক্তিও কখনও কখনও একাকীত্বের ভারে নুয়ে পড়ে। দীর্ঘ পথ, অচেনা মুখ আর গন্তব্যের অনিশ্চয়তা এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি করে। আমি বাইরে তাকাচ্ছিলাম, কিন্তু আসলে দেখছিলাম না। আমার চোখ ছিল মাঠে, বৃক্ষে, ছোট ছোট জনপদে, কিন্তু মন ছিল হাজার মাইল দূরে—নিজের ভেতরে।
আমার সামনের সিটে যিনি বসেছিলেন, তিনি ছিলেন একজন মহিলা। তার মাথায় জড়ানো ছিল নীল-সাদা চেকের একটি ওড়না বা শাড়ি, যা প্রথম ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ওড়নার ফাঁক দিয়ে তার আলতো নড়াচড়া টের পাওয়া যাচ্ছিল। আর তার পাশেই ছিল একটি ছোট ছেলে, হয়তো পাঁচ বা ছয় বছর বয়স। বাচ্চাদের সহজাত চঞ্চলতা তাকে এই যাত্রাতেও স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। কানে আসছিল তার মৃদু ফিসফিসানি, কখনও খেলনার গাড়ির চাকার মতো পা দিয়ে সিটের পেছনে আলতো টোকা। সে হয়তো তার মাকে বারবার জিজ্ঞাসা করছিল—‘আর কত দূর? আমরা কি পৌঁছে গেছি?’ কিন্তু সেই জিজ্ঞাসাগুলো বাসের ইঞ্জিনের একটানা আওয়াজে প্রায় মিলিয়ে যাচ্ছিল।
সময় যেন থমকে গিয়েছিল। যাত্রার মাঝপথ, এই সময়টা সবচেয়ে বেশি ক্লান্তিকর—গন্তব্য তখনও অনেক দূরে, আর ফেলে আসা পথও কম নয়। সবাই তখন হয় ঘুমন্ত, নয়তো তন্দ্রাচ্ছন্ন। বাইরে তপ্ত হাওয়া আর ভেতরে শীতল নীরবতা। ঠিক সেই অবসাদগ্রস্ত মুহূর্তে, সিটের নিচে সামান্য যে ফাঁকা জায়গাটা ছিল, সেই লাল ফ্রেমের নিচ দিয়ে হঠাৎ কিছু একটা নড়ে উঠল।
প্রথমে আমি ভেবেছিলাম হয়তো কোনো ব্যাগ বা কাপড়ের অংশ সরে গেছে। কিন্তু না, সেটি ছিল একটি ছোট্ট হাত। ছেলেটির হাত।
হাতটি ছিল তুলতুলে, আঙুলগুলো গোলগাল, সদ্য ধোয়া বাসের কাঁচের মতোই ঝকঝকে। হাতটি বের হওয়ার ভঙ্গিটি ছিল বেশ দ্বিধাগ্রস্ত—যেন পৃথিবীর এই প্রান্তে এসে সে কিছুটা ভয় পাচ্ছে, আবার ভেতরে ভেতরে তার কৌতূহলও অদম্য। এটি ছিল একটি নীরব প্রশ্ন, একটি অলিখিত আমন্ত্রণ। এটা স্পষ্টতই কোনো ভিক্ষার হাত ছিল না, বা কোনো সাহায্যের আবেদনও ছিল না—এটি ছিল কেবলই এক শিশুর খেলার সঙ্গী খোঁজার সরল প্রচেষ্টা। এই বিশাল পৃথিবীতে, এই সংকীর্ণ বাসযাত্রায়, সে তার চারপাশের অচেনা মানুষদের সঙ্গে একটি সংযোগ তৈরি করতে চাইছিল।
আমার সারা শরীরের আলস্য মুহূর্তের মধ্যে কেটে গেল। দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততা আমাকে প্রথমে বলতে চাইলো—‘অপেক্ষা করো, এটা এড়িয়ে যাও।’ কিন্তু সেই ছোট্ট হাতের নিষ্পাপ সারল্য আমার সেই দেয়াল ভেঙে দিল। সেই হাতটি সেখানে স্থির হয়ে অপেক্ষা করছিল—নাছোড়বান্দা একটি আশার প্রতীক হয়ে। এই মুহূর্তে, আমি একজন অচেনা যাত্রী নই, কেবল একজন মানুষ।
আমি আমার হাতটা সন্তর্পণে এগিয়ে দিলাম। আমার হাতটি ছেলেটির হাতের তুলনায় ছিল অনেক বড়, কর্মঠ, হয়তো কিছুটা রুক্ষ। যখন আমার আঙুলগুলো সেই নরম, তুলতুলে হাতের স্পর্শ পেল, একটা বিদ্যুত্প্রবাহ যেন আমার ভেতর দিয়ে চলে গেল। সেই মুহূর্তটি ছিল নীরবতার চেয়েও নিবিড়। আমরা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না, তবু দুটি হাত যেন সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন জগতকে এক করে দিল। আমার মনে হলো, আমি শুধু একটা হাত ধরিনি, আমি ধরেছি তার কৌতূহলকে, তার আনন্দকে, তার নির্ভেজাল বিশ্বাসকে।
সেই সংযোগ ছিল একান্তই ক্ষণিকের। হাতের উষ্ণতাটুকু অনুভব করার আগেই, হয়তো বা তার মা তাকে দেখতে পেয়েছিলেন, কিংবা সে নিজেই তার কৌতূহল নিবৃত্ত করতে পেরেছিল—হাতটি দ্রুতই সিটের আড়াল দিয়ে ভেতরে টেনে নেওয়া হলো।
কিন্তু সেই এক সেকেন্ডের নীরব চুক্তি আমার ভেতরে এক গভীর প্রভাব ফেলে গেল। ছেলেটি হয়তো দু-মিনিট পরই সব ভুলে তার অন্য খেলায় মনোযোগ দিল। কিন্তু আমি ভুলতে পারলাম না। গাড়ির ইঞ্জিনের একটানা শব্দ তখন আমার কানে আর একঘেয়ে লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, প্রতিটা ঝাঁকুনি যেন সেই ছোট্ট হাতের নরম স্পর্শের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
বাসের জানালার কাঁচের বাইরে তপ্ত রোদ তখনো তার তেজ দেখাচ্ছে, কিন্তু আমার ভেতরে যেন এক ফোঁটা স্নিগ্ধ বৃষ্টির আগমন ঘটেছে। জীবনের দীর্ঘ যাত্রাপথে আমরা সবাই কত শত মানুষের ভিড়ে একা হয়ে যাই। সেই ভিড়ে, একটি সম্পূর্ণ অচেনা শিশু যখন সিটের ফাঁক দিয়ে তার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে দেয় বন্ধুত্বের জন্য, তখন মনে হয়—মানুষের মাঝে যে সম্পর্কগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো আসলে কোনো ভাষা বা প্রতিশ্রুতির তোয়াক্কা করে না। সেগুলো জন্ম নেয় মুহূর্তের সারল্য আর উষ্ণতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে।
যাত্রা এখনো বাকি, কিন্তু এখন আর তা ক্লান্তিকর নয়। আমি এখন আমার ভেতরে সেই ছোট্ট হাতের নরম স্পর্শের রেশ নিয়ে বাকি পথটুকু হাসিমুখে পাড়ি দিতে প্রস্তুত।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন