গল্পের নাম: অস্তিত্বের ঘ্রাণ
অনিকের আওয়াজে মা ধড়মড় করে জেগে উঠলেন। — "ফিলি বাবা? খাবার গরম করব?" অনিক বিরক্তি নিয়ে বলল, "মা, তোমাকে কতবার বলেছি আমার জন্য জেগে থাকবে না। আমি খেয়ে এসেছি। তুমি ঘুমাও।" মা একটু লজ্জিত হাসি হাসলেন। গায়ের কাপড়টা ঠিক করতে করতে বললেন, "ঘুম তো আসছিল না রে। ভাবলাম তুই এলে এক গ্লাস জল অন্তত এগিয়ে দিতে পারব।"
অনিক কোনো উত্তর না দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। মায়ের এই অতিরিক্ত যত্ন মাঝে মাঝে তার কাছে খুব 'ব্যাকডেটেড' আর 'অস্বস্তিকর' লাগে। ও এখন বড় হয়েছে, বড় পজিশনে চাকরি করে, নিজের খেয়াল নিজেই রাখতে পারে—এটা মা কিছুতেই বুঝতে চান না।
পরদিন শুক্রবার। ছুটির দিন। অনিক পুরোনো কাগজপত্রের ফাইল খুঁজছিল। আলমারির তাক খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ তার হাত ঠেকল মায়ের পুরনো জং ধরা টিনের ট্রাঙ্কটায়। এই ট্রাঙ্কটা মা আগলে রাখেন যক্ষের ধনের মতো। অনিক বহুবার বলেছে এটা ফেলে দিতে, কিন্তু মা শোনেননি। কৌতূহলবশত অনিক ট্রাঙ্কটা নামাল। ডালা খুলতেই ন্যাপথালিন আর পুরনো কাপড়ের একটা ভুরভুরে গন্ধ নাকে এল—মায়ের গায়ের গন্ধের মতো।
ভেতরে শাড়ি, কিছু পুরনো বাসন আর একটা লাল মলাটের খাতা। খাতাটা হাতে নিতেই অনিক বুঝল, এটা মায়ের হিসাবের খাতা। মা সংসারের পাই-পয়সার হিসাব রাখতেন একসময়। কিন্তু পাতা উল্টাতেই অনিকের ভ্রু কুঁচকে গেল। এটা শুধু টাকার হিসাব নয়, এটা যেন সময়ের দলিল।
১৯৯৮ সাল, ১০ই অক্টোবর: "আজ অনিকের খুব জ্বর। ডাক্তার বলেছে ভালো খাবার খাওয়াতে। আমার কাছে বাজার করার মতো টাকা নেই। বিয়ের সময় পাওয়া শেষ সোনার আংটিটা আজ বিক্রি করে দিলাম। ও যেন না জানে। জানলে কষ্ট পাবে। ওর বাবা জানলে রাগ করবে, তাই লিখে রাখলাম—হারিয়ে গেছে।"
অনিকের হাতটা কেঁপে উঠল। সে স্পষ্ট মনে করতে পারে সেই সময়ের কথা। সে তখন ক্লাস ফোরে পড়ে। মা তাকে বলেছিল, আংটিটা বাথরুমে পড়ে গেছে। বাবা মাকে কত বকাঝকা করেছিলেন অসাবধানতার জন্য! মা সেদিন একটা কথাও বলেননি, শুধু আঁচল দিয়ে চোখ মুছেছিলেন। আর অনিক? সে দিব্যি মাছ-মাংস খেয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছিল।
পাতা উল্টাতে লাগল অনিক।
২০০৫ সাল, ১৪ই এপ্রিল: "অনিকের বন্ধুদের সবার দামি কেডস আছে। ও স্কুল থেকে এসে খুব কাঁদল। ওর নাকি খুব লজ্জা করে পুরনো জুতো পরে যেতে। আমি মাসের বাজারের টাকা থেকে একটু একটু করে জমিয়ে রেখেছিলাম আমার চশমা বদলাব বলে। চশমাটা থাক, ঝাপসা চোখেও কাজ চলে যাবে। কাল ওর জন্য নতুন জুতো আনব। আমার ছেলের মুখে হাসি ফুটলে আমার পৃথিবী পরিষ্কার হয়ে যায়।"
অনিকের মনে পড়ল সেই সাদা কেডসগুলোর কথা। সে কী খুশিই না হয়েছিল! কিন্তু একবারও খেয়াল করেনি যে মায়ের চশমার কাঁচটা ফাটা ছিল প্রায় ছ'মাস ধরে। মা সেলাই করতেন ওই ভাঙা চশমা পরেই। অনিক তখন নিজের আনন্দে এতই মগ্ন ছিল যে মায়ের ত্যাগের ছিটেফোঁটাও তার চোখে পড়েনি।
২০১৫ সাল, ঈদের আগের দিন: "অনিক আজ ফোন করেছিল। ও এবারও ঈদে বাড়ি আসবে না। অফিসের কাজ। খুব কান্না পাচ্ছিল, কিন্তু ওকে বুঝতে দিইনি। ও বলল, 'মা, টাকা পাঠিয়েছি, নিজের জন্য ভালো একটা শাড়ি কিনো।' বোকা ছেলেটা জানে না, ও বাড়ি না এলে বেনারসি পরলেও আমার ঈদ হয় না। তবুও ওর মঙ্গলের জন্য দোয়াই করলাম। ও ভালো থাকুক, সুখে থাকুক।"
অনিকের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। সেদিনের কথা মনে আছে তার। সে আসলে বন্ধুদের সাথে ট্যুরে গিয়েছিল, মাকে মিথ্যে বলেছিল অফিসের কাজের কথা। মা কি সেটা বুঝতে পেরেছিলেন? হয়তো মায়ের মন সব বোঝে।
ডায়েরির শেষ পাতাটা লেখা হয়েছে মাত্র তিন দিন আগে। লেখাটা একটু অস্পষ্ট, মায়ের হাত হয়তো কাঁপছিল।
বর্তমান: "অনিক ইদানীং খুব ব্যস্ত। আমার সাথে কথা বলার সময় পায় না। সেদিন ওর ঘরে ভুল করে ঢুকে পড়েছিলাম যখন ও মিটিংয়ে ছিল। ও খুব রেগে গিয়ে বলল, 'মা, তুমি কেন বারবার ডিস্টার্ব করো?' আমার খুব লজ্জা লাগল। আমি কি খুব বোঝা হয়ে যাচ্ছি ওর কাছে? আমি তো শুধু দেখতে গিয়েছিলাম ও ঠিকমতো খেয়েছে কি না। শরীরটা আজকাল ভালো যাচ্ছে না। বুকটা খুব ধড়ফড় করে। কিন্তু অনিককে বলব না। ও ব্যস্ত, টেনশন করবে। আমি চলে গেলে ওর হয়তো একটু শান্তি হবে, নিজের মতো থাকতে পারবে।"
খাতাটা অনিকের হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল। বাইরের আকাশটা আজ খুব পরিষ্কার, কিন্তু অনিকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। সে নিজেকে খুব আধুনিক, শিক্ষিত আর সফল মনে করত। কিন্তু আজ এই জং ধরা ট্রাঙ্কের সামনে বসে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যর্থ আর দরিদ্র মানুষ মনে হচ্ছে।
সে দৌড়ে মায়ের ঘরের দিকে গেল। মা তখন জায়নামাজে বসে আছেন। জোহরের নামাজ শেষ করে মোনাজাত ধরেছেন। অনিক দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনল, মা ফিসফিস করে বলছেন, "হে আল্লাহ, আমার অনিককে তুমি ভালো রেখো। ওর যেন কোনো বিপদ না হয়। ওর সব মুশকিল তুমি আসান করে দিও। আর আমাকে মাফ করে দিও যদি আমি ওর কোনো কষ্টের কারণ হই।"
অনিক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে মায়ের পিঠ জড়িয়ে ধরল। জায়নামাজেই মায়ের কোলে মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে উঠল সে। মা চমকে উঠলেন। অনিকের মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যস্ত হয়ে বললেন, "কী হয়েছে বাবা? শরীর খারাপ লাগছে? অফিসে কিছু হয়েছে?"
অনিক কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু মায়ের জীর্ণ শাড়ির আঁচলটা মুঠো করে ধরে রইল। এই সেই গন্ধ। ন্যাপথালিন, হলুদ আর ঘামের মিশেলে তৈরি এক অদ্ভুত গন্ধ—যা পৃথিবীর কোনো দামি পারফিউমে নেই। এই গন্ধটা নিরাপত্তার, এই গন্ধটা নিঃস্বার্থ ভালোবাসার।
অনিকের কান্না দেখে মায়ের চোখও ভিজে উঠল। তিনি জানেন না কেন ছেলে কাঁদছে, তবুও তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে রাখলেন। ঠিক যেমন ছোটবেলায় মেঘ ডাকলে অনিক মায়ের বুকে মুখ লুকাত।
কিছুক্ষণ পর অনিক মুখ তুলল। মায়ের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, "মা, আজ বিকেলে আমরা ঘুরতে যাব।" মা অবাক হয়ে বললেন, "কোথায়? তোর না কাজ আছে?" — "কাজ থাকলেও যাব। তোমার সেই পছন্দের শাড়ির দোকানে যাব, তারপর ফুচকা খাব। আর শোনো, কাল থেকে তুমি আমার ঘরে যখন খুশি আসবে। মিটিং থাক বা না থাক, তুমি এলে আমার কোনো ডিস্টার্ব হয় না মা। তুমিই তো আমার সব।"
মা কিছু বললেন না, শুধু তাঁর ঝাপসা চোখের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে যেন হাজার ওয়াটের আলো। অনিক বুঝল, মায়ের এই হাসিটার দাম তার অফিসের যেকোনো প্রমোশনের চেয়ে অনেক বেশি।
বিকেলে মাকে নিয়ে রিকশায় করে যাওয়ার সময় অনিক ভাবছিল, আমরা সারা জীবন সুখ খুঁজি বাইরে, অথচ সুখের খনিটা আমাদের ঘরেই অপেক্ষায় থাকে। মায়েরা কিছু চায় না, শুধু একটু সময় আর দুটো মিষ্টি কথা চায়।
অনিক মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ওই ডায়েরির শেষ পাতায় সে আর কোনো কষ্টের কথা লিখতে দেবে না। এখন থেকে ডায়েরির পাতায় শুধু আনন্দের গল্প থাকবে। কারণ, মা আছে বলেই অনিকের অস্তিত্ব আছে। মায়ের হৃদস্পন্দন থেমে গেলে অনিকের পৃথিবীটাও যে নিথর হয়ে যাবে।
লেখকের নোট ও পাঠকের জন্য ভাবনা
গল্পটি পড়ার পর হয়তো আপনারও ইচ্ছে করছে এখনই মায়ের কাছে ছুটে যেতে বা মাকে একটা ফোন করতে। দেরি করবেন না। আমাদের ব্যস্ততা কোনোদিন শেষ হবে না, কিন্তু মা একদিন হারিয়ে যাবেন। তখন হাজারো চোখের জল বা অনুশোচনা মাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
আজই মাকে বলুন, "মা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি।"

❤️❤️❤️
উত্তরমুছুন