সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

“বাবার পুরনো ঘড়ি”

 



সাকিব সবসময় সময়ের পেছনে দৌড়াতো। কর্পোরেট লাইফে সে এখন সিনিয়র পজিশনে—মিটিং, টার্গেট, ডেডলাইন… জীবনটা যেন একটাই KPI: “আরও এগিয়ে যেতে হবে।”


কিন্তু এই দৌড়ের ভেতরে একটা জিনিস সে খেয়ালই করেনি—সময়ের সাথে সাথে তার নিজের মানুষগুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে।


তার বাবা ছিলেন একেবারে সাধারণ মানুষ। ছোট্ট একটা দোকান চালাতেন। সেই দোকানের আয়ে সংসার, সাকিবের পড়াশোনা—সব কিছুই চালাতেন।

আর মা? মা সবসময় ছায়ার মতো ছিল—নীরবে, নির্ভরতার জায়গা হয়ে।


একদিন সাকিব শহরে বড় চাকরি পেল। যাওয়ার আগে বাবা একটা পুরনো হাতঘড়ি তার হাতে পরিয়ে দিলেন।

বললেন—

“সময়কে ধরে রাখিস না বাবা… শুধু মনে রাখিস, সময় চলে গেলে আর ফিরে আসে না।”


সাকিব একটু হেসে বলেছিল—

“এই পুরনো ঘড়ি দিয়ে কি হবে বাবা? এখন তো ফোনেই সব হয়।”


বাবা কিছু বলেননি। শুধু মৃদু হাসলেন।


তারপর শুরু হলো সাকিবের শহুরে জীবন।

প্রথমে সপ্তাহে একবার ফোন, তারপর মাসে একবার… তারপর শুধু ঈদে।


মাঝে মাঝে মা ফোন করতেন—

“বাবা, কবে আসবি?”

সাকিব বলত—

“মা, খুব ব্যস্ত… প্রজেক্ট শেষ হলে আসব।”


কিন্তু সেই “প্রজেক্ট” যেন কখনো শেষ হতো না।


একদিন হঠাৎ করে সাকিবের অফিসে কল এলো। গ্রামের প্রতিবেশী কাকা—

“বাবা, তোর বাবা খুব অসুস্থ… তাড়াতাড়ি আয়।”


সাকিব তখন মিটিংয়ে ছিল।

সে বলল—

“আমি কাল আসছি…”


কিন্তু “কাল” আর তার জন্য অপেক্ষা করেনি।


পরদিন সকালে যখন সে বাড়ি পৌঁছাল, তখন সব শেষ।

বাড়ির উঠোনে সাদা কাপড়ে ঢাকা বাবার নিথর দেহ…


সাকিবের মনে হলো—তার ভেতরের সবকিছু যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়েছে।


সে বাবার পাশে বসে কাঁদতে লাগল—

“বাবা… আমি তো আসছিলাম…”


কেউ উত্তর দিল না।


সবকিছু শেষ হওয়ার পর, মা চুপচাপ একটা ছোট্ট বাক্স তার হাতে দিলেন।

বললেন—

“তোর বাবার শেষ জিনিস… তোকে দিতে বলেছিল।”


সাকিব বাক্সটা খুলল।

ভেতরে সেই পুরনো হাতঘড়ি… আর একটা ছোট্ট কাগজ।


কাগজে লেখা—


“বাবা,

তুই যখন এই ঘড়িটা আবার হাতে নিবি, তখন হয়তো আমি থাকব না।

জানি তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস, অনেক ব্যস্ত।


আমি শুধু চাইতাম, মাঝে মাঝে তোর সাথে বসে একটু গল্প করতে…

তোর ছোটবেলার মতো, যখন তুই আমার হাত ধরে হাঁটতিস।


সময়টা খুব ছোট, বাবা।

টাকা, সফলতা—সবই থাকবে, কিন্তু এই সময়টা আর ফিরে আসবে না…”


সাকিবের হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল।

সে ঘড়িটা হাতে পরল—

কিন্তু আজ সেই ঘড়ির কাঁটা যেন প্রতিটা সেকেন্ডে তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—

সে কতটা দেরি করে ফেলেছে।


সেই রাতে সাকিব মায়ের পাশে বসে ছিল।

অনেক দিন পর… কোনো তাড়া নেই, কোনো মিটিং নেই।


মা চুপচাপ বললেন—

“তোর বাবা প্রতিদিন তোর জন্য অপেক্ষা করত…”


এই কথাটা শুনে সাকিব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।


আমরা জীবনে অনেক কিছু অর্জন করি—

পদ, টাকা, স্ট্যাটাস…

কিন্তু একটা সময় পরে বুঝি—

সবচেয়ে বড় “অ্যাসেট” ছিল, যাদের জন্য আমরা সময়ই দেইনি।


শেষে শুধু একটা প্রশ্নই থেকে যায়—

“আমি কি সত্যিই সময়মতো ফিরেছিলাম?”

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এক দরিদ্র কাঠুরে ও আল্লাহর অলৌকিক রিযিকের গল্প: যা আপনার চোখ খুলে দেবে

  Muhabbot Hossain বর্তমান সময়ে আমরা অনেকেই রিযিক বা জীবিকা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় থাকি। একটু আর্থিক অনটন আসলেই আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু আমরা...