সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

“শেষ চিঠিটা”

 


রাত তখন প্রায় ২টা। শহরের ব্যস্ততা থেমে গেছে, কিন্তু রিয়াদের চোখে ঘুম নেই। হাতে মোবাইল, কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েও কিছু দেখতে পাচ্ছে না। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভারী লাগছে। আজ অফিস থেকে ফেরার পর হঠাৎ করেই মনে হলো—অনেক দিন বাবা-মার সাথে ঠিক করে কথা বলা হয়নি।


রিয়াদ এখন বড় একটা কর্পোরেট কোম্পানিতে কাজ করে। ভালো বেতন, ফ্ল্যাট, গাড়ি—সব আছে। কিন্তু এই “সব” পেতে গিয়ে সে যেন কোথাও কিছু হারিয়ে ফেলেছে… যেটা টাকা দিয়ে আর কেনা যায় না।


তার মনে পড়ে গেল—ছোটবেলায় বাবা প্রতিদিন সকালে তাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। নিজের পুরনো সাইকেলে বসিয়ে, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে। আর মা? মা তো প্রতিদিন ভোরে উঠে তার টিফিন বানাতেন, নিজের খাবারের চেয়ে তার খাবারটা ভালো হয় কিনা সেটাই ভাবতেন।


একদিন রাতে অফিস থেকে দেরি করে ফিরছিল রিয়াদ। তখন মা ফোন করেছিল—

“বাবা, খেয়েছো?”

রিয়াদ বিরক্ত হয়ে বলেছিল—

“মা, এত ফোন দিও না তো! আমি ব্যস্ত আছি!”


মা তখন চুপ করে গিয়েছিল। শুধু বলেছিল—

“ঠিক আছে বাবা, ভালো থেকো…”


সেদিন রিয়াদ বুঝতে পারেনি, ওই “ভালো থেকো” কথার ভেতরে কতটা কষ্ট লুকিয়ে ছিল।


আজ অনেক দিন পর হঠাৎ করেই রিয়াদ আলমারির ভেতর একটা পুরনো খাম পেল। খামের উপর লেখা—

“আমার ছেলের জন্য”


হাত কাঁপতে কাঁপতে খামটা খুলল সে। ভেতরে একটা চিঠি—মায়ের হাতের লেখা।


চিঠিতে লেখা ছিল—


“বাবা,

তুই যখন এই চিঠিটা পড়বি, তখন হয়তো আমি তোর সামনে থাকব না।

জানি তুই অনেক ব্যস্ত, অনেক বড় হয়েছিস।

আমরা তোকে কখনো কিছু দিতে পারিনি, শুধু চেষ্টা করেছি মানুষ করতে।


তুই যখন ছোট ছিলি, তোর একটা হাসির জন্য আমরা কত কিছু করেছি—তুই জানিস না।

আজ তুই বড় হয়েছিস, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সুখ।


শুধু একটা কথা মনে রাখিস—

জীবনে যত বড়ই হ, কখনো যেন নিজের মানুষদের ভুলে না যাস।


আমরা তোকে খুব ভালোবাসি, বাবা…”


চিঠিটা পড়তে পড়তে রিয়াদের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। হাত কাঁপছে, বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে।


হঠাৎ করে তার মনে পড়ল—গত মাসে বাবা অসুস্থ হয়েছিল। মা ফোন করেছিল, কিন্তু সে মিটিংয়ে ছিল বলে রিসিভ করেনি। পরে আর কল ব্যাকও করেনি।


পরদিন সকালে রিয়াদ সব কাজ ফেলে গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা দিল।

বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বুকটা কেঁপে উঠল। সবকিছু আগের মতোই আছে, শুধু একটা অদ্ভুত নীরবতা…


দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল—বাবা চুপচাপ বসে আছেন। চোখে ক্লান্তি, মুখে হাসি আনার চেষ্টা।

রিয়াদ দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল—

“বাবা… আমি দেরি করে ফেলেছি…”


বাবা শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন—

“না রে বাবা… তুই আসছিস, এটাই তো অনেক…”


কিন্তু মাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।


রিয়াদ কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল—

“মা কোথায়?”


বাবা একটু চুপ করে থেকে বললেন—

“তোর মা… গত সপ্তাহে চলে গেছে…”


মুহূর্তেই সবকিছু থেমে গেল।

রিয়াদের মনে হলো—সময় যেন তার সাথে একটা নিষ্ঠুর খেলা খেলেছে।


সে মায়ের ঘরে ঢুকল। বিছানার পাশে বসে পড়ল। বালিশটা এখনো মায়ের গন্ধে ভরা।

হঠাৎ করে সে ভেঙে পড়ল—

“মা… আমি তো শুধু একটু ব্যস্ত ছিলাম… এতটাই দূরে চলে যাবি?”


কোনো উত্তর এল না।

শুধু নীরবতা…


সেই রাতে রিয়াদ আবার সেই চিঠিটা পড়ল।

আর বুঝতে পারল—

জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সে করে ফেলেছে।


আমরা প্রায়ই ভাবি—সময় আছে, পরে কথা বলব, পরে সময় দেব।

কিন্তু “পরে” নামের সেই সময়টা অনেক সময় আর আসে না।


শেষে শুধু আফসোসটাই থেকে যায়…

আর কিছু অশ্রু, যেগুলো কেউ দেখে না… শুধু হৃদয় জানে।


যাদের বাবা-মা এখনো বেঁচে আছেন—

আজই একটা ফোন করুন।

একটু সময় দিন।

কারণ একদিন হয়তো এই সুযোগটা আর থাকবে না…

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এক দরিদ্র কাঠুরে ও আল্লাহর অলৌকিক রিযিকের গল্প: যা আপনার চোখ খুলে দেবে

  Muhabbot Hossain বর্তমান সময়ে আমরা অনেকেই রিযিক বা জীবিকা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় থাকি। একটু আর্থিক অনটন আসলেই আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু আমরা...